হাজারো ব্যর্থতা পেরিয়ে বিশ্বজয়: জ্যাক মা’র অবিশ্বাস্য জীবন কাহিনি....
চীনের আলিবাবা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা-এর জীবনের প্রতিটি ধাপ ব্যর্থতার এক দীর্ঘ তালিকা। ....
বিশ্বের হাতেগোনা যে কজন ব্যক্তি কেবল একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে একটি শিল্পকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছেন, জ্যাক মা (Ma Yun) নিঃসন্দেহে তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আলিবাবা গ্রুপ (Alibaba Group) আজ চীনের ই-কমার্স সাম্রাজ্যের মুকুটহীন সম্রাট, যার বাজারমূল্য হাজার হাজার কোটি ডলার। কিন্তু এই পর্বতপ্রমাণ সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক সাধারণ মানুষের হাজারো ব্যর্থতা ও অপমানের দীর্ঘ ইতিহাস। জ্যাক মা’র জীবন কাহিনি সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং প্রত্যাখ্যানকে হাসিমুখে মেনে নেওয়ার এক জীবন্ত দলিল।
সাধারণ পরিবারে জন্ম ও ইংরেজির প্রতি আকর্ষণ
১৯৬৪ সালে চীনের চচিয়াং প্রদেশের হাংচৌ শহরে এক দরিদ্র পরিবারে মা ইউন (Ma Yun) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা-মা ছিলেন ঐতিহ্যবাহী গল্প বলিয়ে এবং সঙ্গীত শিল্পী, যার ফলে সংসারে আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না বললেই চলে। ছোটবেলা থেকেই জ্যাক মা পড়াশোনায় খুব একটা ভালো ছিলেন না, বিশেষত গণিত ছিল তাঁর দুর্বলতার জায়গা। কিন্তু তাঁর ছিল একটি অসাধারণ কৌতূহল—ইংরেজি ভাষা শেখার প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আগ্রহ। এই আগ্রহ থেকেই মাত্র বারো বছর বয়স থেকে তিনি প্রায় নয় বছর ধরে প্রতিদিন সকালে ৭০ মাইল সাইকেল চালিয়ে হাংচৌ ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে যেতেন। সেখানে বিদেশী পর্যটকদের বিনামূল্যে গাইড হিসেবে ঘোরার বিনিময়ে তিনি তাদের সাথে ইংরেজি অনুশীলন করতেন। এই সময়ই একজন আমেরিকান পর্যটক মা ইউন-এর চীনা নামটি ইংরেজদের জন্য উচ্চারণ কঠিন হওয়ায় তাঁকে 'জ্যাক' নামে ডাকতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে বিশ্বের কাছে তাঁর পরিচিতি হয়ে ওঠে।
ব্যর্থতার এক দীর্ঘ তালিকা: শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে চাকরি
ব্যর্থতার সঙ্গে জ্যাক মা’র সম্পর্ক তাঁর শৈশব থেকেই শুরু। প্রাথমিক স্কুলের পরীক্ষায় তিনি দু’বার ফেল করেন এবং মাধ্যমিক স্কুলের পরীক্ষাতেও তিনবার ব্যর্থ হন। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এই ব্যর্থতার ধারা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চীনের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা অত্যন্ত কঠিন, এবং জ্যাক মা এই পরীক্ষায় মোট তিনবার ফেল করার পর অবশেষে হাংচৌ নরমাল ইউনিভার্সিটির (তৎকালীন হাংচৌ টিচার্স ইনস্টিটিউট) ইংরেজি বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান। এই পরীক্ষার গণিত অংশে তিনি মাত্র ১ নম্বর পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, তিনি আমেরিকার বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য মোট দশবার আবেদন করেছিলেন এবং প্রতিবারই প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন।
কলেজে ইংরেজি নিয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর শুরু হয় তাঁর কর্মজীবনের জন্য লড়াই, যেখানে ব্যর্থতা যেন তাঁর পিছু ছাড়ছিল না। তিনি বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৩০টি চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন এবং প্রতিটি স্থান থেকেই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি বিখ্যাত ঘটনা হলো—একবার কেন্টাকি ফ্রায়েড চিকেন (KFC) হাংচৌ-এ তাদের প্রথম শাখা খোলার সময় চাকরির জন্য লোক নিচ্ছিল। চব্বিশ জন আবেদনকারীর মধ্যে তেইশ জনের চাকরি হলেও, একমাত্র জ্যাক মা-কেই বাদ দেওয়া হয়। এমনকি পুলিশ বাহিনীতে চাকরির আবেদন করেও তাঁকে প্রত্যাখ্যাত হতে হয় এই বলে যে, 'না, আপনি যোগ্য নন।' বারবার প্রত্যাখ্যানের পর তিনি অবশেষে হাংচৌ দিয়ানজি ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন, যেখানে তাঁর মাসিক বেতন ছিল মাত্র ১২ ডলার।
ইন্টারনেট বিপ্লবের সূত্রপাত: চীনের ই-কমার্স পথপ্রদর্শক
১৯৯৫ সালে একটি চীনা সংস্থার অনুবাদক হিসেবে জ্যাক মা প্রথম আমেরিকায় ভ্রমণ করার সুযোগ পান এবং সেখানেই তিনি প্রথমবার ইন্টারনেটের সংস্পর্শে আসেন। ইন্টারনেটের সীমাহীন সম্ভাবনা উপলব্ধি করে তিনি চীনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। চীনে ফিরে তিনি তাঁর বন্ধু ও সহকর্মীদের সামনে এই ব্যবসার ধারণা তুলে ধরেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তাঁর এই বিপ্লবী ধারণাকে হাসি-ঠাট্টার বিষয় বলে উড়িয়ে দেন।
দীর্ঘ ব্যর্থতার পর নিজের স্বপ্নের প্রতি অবিচল থেকে, ১৯৯৯ সালে তিনি তাঁর ছোট অ্যাপার্টমেন্টে মোট ১৮ জন বন্ধু ও সহ-প্রতিষ্ঠাতাকে নিয়ে শুরু করেন 'আলিবাবা' (Alibaba)। প্রথম দিকে পুঁজি এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান কোনটিরই পর্যাপ্ত যোগান ছিল না। শুরুতে আলিবাবা ছিল বিশ্বের অন্যান্য ছোট ছোট ব্যবসায়ীর সাথে চীনের উৎপাদনকারীদের যুক্ত করার একটি বিজনেস-টু-বিজনেস (B2B) প্ল্যাটফর্ম।
আলিবাবা’র বিশ্বজয়: তাobao এবং আলিপে-এর উদ্ভাবন
আলিবাবার সাফল্যের আসল পরীক্ষা আসে ২০০৩ সালে, যখন আমেরিকান ই-কমার্স জায়ান্ট ই-বে (eBay) চীনের বাজারে আগ্রাসীভাবে প্রবেশ করে। সরাসরি প্রতিযোগিতায় না গিয়ে জ্যাক মা সম্পূর্ণ নতুন একটি গ্রাহক-থেকে-গ্রাহক (C2C) প্ল্যাটফর্ম, 'তাওবাও' (Taobao) চালু করার সিদ্ধান্ত নেন। ই-বে যখন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের জন্য ফি নিত, তখন তাobao ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য বিনামূল্যে লিস্টিংয়ের সুবিধা দেয়। এই যুগান্তকারী কৌশল চীনের বাজারকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে এবং অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ই-বে চীনা বাজার থেকে কার্যত বিদায় নিতে বাধ্য হয়।
কিন্তু ই-কমার্স-এ গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করাই ছিল চীনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আলিবাবা তৈরি করে 'আলিপে' (Alipay)। আলিপে ছিল এমন একটি এসক্রো-ভিত্তিক (escrow-based) পেমেন্ট সিস্টেম, যেখানে ক্রেতা পণ্য হাতে পাওয়ার পর নিশ্চিত করলেই তবে বিক্রেতার কাছে অর্থ পৌঁছাত। এই উদ্ভাবনী পদ্ধতি চীনাদের মধ্যে অনলাইনে কেনাকাটার প্রতি আস্থা তৈরি করে এবং দেশের ই-কমার্স ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেয়।
এই উদ্ভাবন ও দ্রুত প্রসারের ফলস্বরূপ, আলিবাবা গ্রুপ ২০১৪ সালে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে বিশ্বের সর্ববৃহৎ আইপিও (Initial Public Offering) এনে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে। এই আইপিও জ্যাক মা-কে রাতারাতি চীনের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিতে পরিণত করে এবং আলিবাবাকে বিশ্বব্যাপী এক প্রযুক্তি নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও উত্তরাধিকার
২০১৩ সালে জ্যাক মা আলিবাবার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (CEO) পদ থেকে এবং ২০১৯ সালে নির্বাহী চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর ২০২০ সালে চীনের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে তাঁর কিছু বিতর্কের জেরে তাঁর ফিনটেক সংস্থা অ্যান্ট গ্রুপ-এর (Ant Group) আইপিও স্থগিত হয়ে যাওয়ার পর তিনি বেশ কিছুদিন জনসমক্ষে আসেননি। তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি আলিবাবার একজন কৌশলগত পরামর্শদাতা (Strategic Mentor) হিসেবে পুনরায় সক্রিয় হয়েছেন, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো দীর্ঘমেয়াদী উদ্ভাবনী ক্ষেত্রগুলোতে তিনি মনোযোগ দিচ্ছেন।
মে ২০২৫ সাল নাগাদ তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ২৭.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বলে অনুমান করা হয়।
জ্যাক মা’র জীবনের মূল শিক্ষা হলো, ব্যর্থতাকে সাফল্যের বিপরীত বলে গণ্য না করে সেটিকে শিক্ষানবিশ হিসেবে গ্রহণ করা। তিনি বলেন, 'আজ কঠিন, আগামীকাল আরও কঠিন। তবে পরশুদিন হবে উজ্জ্বল।' যিনি প্রাথমিক স্কুল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাকরির জন্য বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, সেই মানুষটিই কেবল নিজের চেষ্টা ও অধ্যবসায় দিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি সাম্রাজ্যের স্থপতি হয়েছেন। জ্যাক মা’র অবিশ্বাস্য জীবন কাহিনি প্রমাণ করে যে, প্রকৃত উদ্যোক্তার কাছে ব্যর্থতা কখনোই থেমে যাওয়ার সংকেত নয়, বরং এটি পরবর্তী সাফল্যের সোপান।
2 Comments